মধুপুরে গাছ সাবাড় করে বনে আগুন: ৭৫ একর বনভূমি জবরদখলের মহোৎসব

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | মধুপুর (টাঙ্গাইল):
  • প্রকাশ্য দিবালোকে গাছ কেটে ইটভাটায় বিক্রি, এরপর বনে দেওয়া হচ্ছে আগুন।

  • সামাজিক বনায়নের আওতায় বরাদ্দকৃত ৭৫ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা।

  • বিট অফিস থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে টানা ১৫ দিন ধরে চলছে এই ধ্বংসযজ্ঞ।

  • বন বিভাগের রহস্যজনক নীরবতা ও দায়সারা বক্তব্যে স্থানীয়দের ক্ষোভ।

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্বিচারে গাছ নিধন এবং বনে আগুন লাগিয়ে প্রায় ৭৫ একর সরকারি বনভূমি জবরদখলের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় টানা দুই সপ্তাহ ধরে এই ধ্বংসযজ্ঞ চললেও বন বিভাগের রহস্যজনক নীরবতা ও নির্লিপ্ত ভূমিকায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

সামাজিক বনায়নের নামে প্রহসন ও ধ্বংসযজ্ঞ: বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দোখলা রেঞ্জের সদর বিটের অরনখোলা মৌজার ২৪ নম্বর দাগের মাগীচেরা এলাকার ৭৫ একর বনভূমি ২০২১-২২ অর্থবছরে ‘সামাজিক বনায়ন’ কর্মসূচির আওতায় ৮৫ জন অংশীদারের মধ্যে প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অংশীদারত্বের ‘উডলট মডেল’-এর এই বনায়নে প্লটধারীরা আকাশমণি গাছের চারা রোপণ করেন এবং ফাঁকে ফাঁকে আনারস ও কলার চাষ শুরু করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, গাছগুলোর বয়স ১০ থেকে ১২ বছর পার হওয়ার পর ‘ক্লিয়ার ফেলিং’ (Clear Felling) পদ্ধতিতে কেটে হিস্যা বণ্টনের কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্লট হোল্ডাররা গাছের বয়স চার বছর পার না হতেই নির্বিচারে সব আকাশমণি গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে চালান করে দিয়েছেন। ফলে ওই এলাকার বনায়ন প্রায় পুরোটাই এখন বৃক্ষশূন্য।

আগুনে পুড়িয়ে জমি দখলের মহোৎসব: গাছ কাটার পর জমিটি পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিতে প্লট মালিকরা বনতলের অবশিষ্টাংশ ও জঙ্গলে সুকৌশলে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুড়ে যাওয়া এই খালি জমিগুলো এখন স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্লট আকারে দখল করে নিচ্ছেন।

সামাজিক বনায়ন সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোত্তালেব হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বনকর্মীদের যোগসাজশেই প্রভাবশালী মহলটি টানা দুই সপ্তাহ ধরে গাছ কেটে জমি বিরান করেছে। এখন আগুন লাগিয়ে পুরো জমি জবরদখল করা হচ্ছে। এসব জমিতে নতুন করে আর বনায়ন হবে না, পুরোটাই দখলদারদের হাতে চলে যাচ্ছে। এভাবেই মধুপুর বনাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি ইতোমধ্যে জবরদখল হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনে সরকারি বনভূমি আরও বেহাত হওয়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে।”

বনকর্মীদের নাকের ডগায় অপরাধ, তবু ‘দায়সারা’ বক্তব্য: স্থানীয় হরিণধরা গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, “যারা এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, এলাকার সবাই তাদের চেনে। কিন্তু বন বিভাগ বন অপরাধী খোঁজার নামে শুধু কালক্ষেপণ করছে।”

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, দোখলা বিট অফিস থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের মাগীচেরায় টানা ১৫ দিন ধরে গাছ কাটা এবং বনে আগুন দেওয়ার মহোৎসব চললেও বিট কর্মকর্তা এ কে আজাদ দাবি করেছেন, তিনি এই খবর পেয়েছেন মাত্র তিন দিন আগে!

দেরিতে খবর পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, “আমি দুই সপ্তাহ আগে এখানে জয়েন করেছি। সবাইকে এখনো চিনি না। তাই কে চোর আর কে সাধু, তা মেলাতে আমাকে তদন্ত করতে হচ্ছে।” অন্যদিকে, দোখলা রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন জানান, দুষ্কৃতকারীরা গাছ কেটে জঙ্গল পুড়িয়ে জবরদখলের পাঁয়তারা করছে বলে তিনি শুনেছেন এবং বিট অফিসার বিষয়টি দেখছেন।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ: সার্বিক বিষয়ে মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, “কয়েকজন প্লট হোল্ডার আকাশমণি বাগান উজাড় করে, আগুনে পুড়িয়ে জমি দখল এবং তা প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করার পাঁয়তারা করছে বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। জড়িত এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

পরিবেশ রক্ষায় মধুপুরের এই প্রাচীন বনভূমির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অনতিবিলম্বে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান এবং বন বিভাগের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.